Jun 21, 2020

কামাল লোহানী: জীবনী, সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের অবদান

কামাল লোহানীর জীবন, সাংবাদিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান তুলে ধরা হয়েছে
কামাল লোহানী (২৬ জুন ১৯৩৪ - ২০ জুন ২০২০)

জীবনের প্রথম ধাপ : কামাল লোহানী ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলা) সনতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী ও মাতা রোকেয়া খান লোহানী। তিনির আসল নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী।তিনি  প্রথমে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে পড়াশুনা শুরু করেন। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাবনায় চলে আসেন।১৯৫২ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

রাজনৈতিক জীবন: কামাল লোহানী ছাত্রজীবনে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন । ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনেও  জড়িত ছিলেন ।১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজে নুরুল আমিন ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতাদের আগমনের বিরোদ্ধে শিক্ষার্থীদের এক প্রতিবাদী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক মঞ্চের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং অনেকের সাথে পুনরায় গ্রেফতার হন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানতাজউদ্দীন আহমদসহ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে কারাবাস করেন। ১৯৫৫ সালের জুলাইতে জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ঢাকা চলে আসেন এবং মার্ক্সবাদের সাথে জড়িত হন। এ সময় তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতি করতেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের সময় অনেকের সাথে আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালেও কারাবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সদস্য ছিলেন।

১৯৭১-২০২০:

কামাল লোহানী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জনের সংবাদ বেতারে তিনিই প্রথম পাঠ করেন। বেতারে তিনি ঘোষণা করেন, “আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর তাকে ঢাকা বেতারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ধারাবিবরণী এবং ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতা সফর উপলক্ষে তৎকালীন দমদম বিমানবন্দরেও (বর্তমান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালে দৈনিক জনপদ নামক একটি পত্রিকাতে যোগদানের মাধ্যমে পুনরায় সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে আসেন। তিনি ১৯৭৪ সালে বঙ্গবার্তা, এরপর "দৈনিক বাংলার বাণী" পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তার নির্বাহী সম্পাদক ও ১৯৭৮ সালে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন।১৯৮১ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধের ফলে দৈনিক বার্তা ছেড়ে দেন এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। ১৬ মাস মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি পুনরায় বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে চলে আসেন। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পুনরায় তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর অবসর গ্রহণ করেন। এবং তিনি চার বছর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন।

 তিনির  রচিত গ্রন্থ  সমূহ :
* আমরা হারবো না 
*মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার
*সত্যি কথা বলতে কী
*যেন ভুলে না যাই
*রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার
*মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার
*আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম
*এ দেশ আমার গর্ব
*লড়াইয়ের গান
*সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার
*শব্দের বিদ্রোহ
*দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত

পারিবারিক জীবন : 

কামাল লোহানী ব্যক্তিজীবনে ১৯৬০ সালে চাচাতো বোন দীপ্তি লোহানীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের  দুই কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। দীপ্তি ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অভিনেতা ফতেহ লোহানী এবং সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী  চাচাত ভাই।

মৃত্যু : কামাল লোহানী ২০২০ সালের ২০ জুন ৮৭ বছর বয়সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেণ।

 তত্ত্ব সূত্র :উইকিপিডিয়া